×

নিজস্ব প্রতিবেদক:


পবিত্র ঈদ উল আযহার আগের দিন জনসম্মুখে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আমেরিকা প্রবাসী আজমুল ফুয়াদ সাজিবের ছুরিকাঘাতে মেহেদী হাসান শান্ত (২৫) নামের এক যুবক নিহত হয়। এই সময় সাজিবের ছুরিকাঘাতে আরো ৪ যুবক আহত হয়। কিন্তু রাতে ঘটনার মোড় নিতে থাকে অন্য দিকে। জানা যায়, দেবিদ্বারের এক চেয়ারম্যানের বাড়িতে নিহত শান্ত’র পরিবারের সদস্যদের ডেকে নিয়ে ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের রফাদফার মাধ্যমে ঘাতক সাজিবকে মামলায় দেখানো হয় ৫ নম্বর স্বাক্ষী হিসেবে। অপরদিকে ঘটনার সময় উপস্থিত স্বাক্ষী ক্যান্সার আক্রান্ত সাদ্দাম হোসেনকে ২ নম্বর আসামি বানিয়ে মামলা করা হয়। ঘটনার এমনভাবে অন্যদিকে মোড় নেয়াকে চরম লজ্জার ও আইনশৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হিসেবেই দেখছেন স্থানীয়রা। মূল ঘাতক সাজিব পুনরায় আমেরিকা চলে যাওয়ার প্রক্রিয়া করছে বলে একাধিক সূত্র জানায়।
জনসম্মুখে যে সাজিব একাই ৫ জনকে ছুরিকাঘাত করেছে, সেই সাজিবকে কিভাবে আসামি না করে স্বাক্ষী করা হল। প্রশাসনই বা কেন চুপ করে এমন মিথ্যে মামলা নিল এ নিয়ে চরম সমালোচনা চলছে দেবিদ্বার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে।
শনিবার (৯ জুলাই) বিকেল ৪ টায় উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের এম, আলী এন্ড এ.বারী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
নিহত মেহেদী হাসান শান্ত ফতেহাবাদ ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের সরকার বাড়ির জাকির হোসেনের ছেলে।
আহতরা হলেন নুরপুর গ্রামের মো: আশরাফুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম, রাসেল মিয়া ও ছিকাব আলম। তারা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নুরপুর গ্রামের সরকার বাড়ির আমেরিকান প্রবাসী সাজিব ও হবির বাড়ির আল আমিনের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সাজিব এলোপাথাড়ি ছুরি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। এ সময় মেহেদী হাসান শান্তসহ ৫ জন আহত হয। শান্তকে হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।

বায়ে নিহত শান্ত, মাঝে অভিযুক্ত সজিব, ডানে সাদ্দাম


স্থানীয় সূত্র আরো জানায়, ঘাতক সাজিব ও নিহত শান্ত একই বাড়ির ছিল। ঘটনার সময় সাজিবকে থামানোর চেষ্টা করলে সাজিবের ছুরিকাঘাতে শান্ত নিহত হয়। অঢেল সম্পদ ও টাকার মালিক হওয়ায় সাজিবের পক্ষে স্থানীয় একাধিক গ্রুপ অবস্থান নেয়। হত্যাকান্ডের পর সন্ধ্যায় শান্ত’র পিতা ও মামাকে এক চেয়ারম্যানের বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে রাত প্রায় সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত গোপনে বিশাল অংকের টাকার বিনিময়ে ( অনেকের মতে কোটি টাকার উপরে) হুমকি দিয়ে রফাদফা হয়। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় ঘাতককে স্বাক্ষী বানানোর। আর ইউপি নির্বাচনের পূর্ব দ্বন্দ্বের ফলে সাদ্দাম হোসেনকে ২ নম্বর আসামি করা হয়। পরে থানায় গিয়ে মামলা করা হয় ।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মো: আশরাফুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম, রাসেল মিয়া ও ছিকাব আলম জানান, সাজিবের হাতে ছুরি ছিল। সে একাই আমাদের সবাইকে এলোপাথারি ছুরিকাঘাত করেছে। শান্ত তার ছুরিকাঘাতেই মারা গেছে। ২ নং আসামি সাদ্দাম এ ঘটনায় জড়িত নয়। সবাই দেখছে সাজিব ছুরিকাঘাত করছে। মামলার এক নম্বর আসামি আলামিনের সাথে সাজিবের কথা কাটাকাটি হলে সাজিব সবাইকে ছুরিকাঘাত করে । এখানে আলামিনকেও অন্যায়ভাবে আসামি করা হয়েছে।
সাদ্দাম হোসেনের বড় দুই ভাই জহিরুল ইসলাম ও জাহিদ হাসান জানান, আমার ছোট ভাই সাদ্দাম হোসেন ২ বছর ধরে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। তাকে ১১ বার কেমোথেরাপি দেয়া হয়েছে। আগামী ১৩ জুলাই ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে আবার কেমোথেরাপি দেয়ার তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। সে ঘটনার সময় দাড়িয়ে ঘটনাটা দেখছে এবং হত্যার ঘটনার স্বাক্ষী দিতে চেয়েছিল। পুলিশ তাকে স্বাক্ষী হিসেবে ডেকে নিয়ে ২ নম্বর আসামি করে ঈদের দিন জেলহাজতে প্রেরণ করেছে। এটাই কি বিচার ? সে তো ঘটনার সত্যতা প্রকাশ করতে চেয়েছিল। অথচ তাকেই আসামি করা হল।
জাহিদ হাসান আরো বলেন, বিগত কয়েক মাস আগে আমি ফতেহাবাদ ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছিলাম। এর ফলে বিপক্ষ প্রার্থীরা অসন্তোষ হয়েছিল। গতকালের হত্যাকান্ডে তারা এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে মূল ঘাতককে আসামি না করে আমার ক্যান্সার আক্রান্ত ভাইকে আসামি করলো। এখানে কোটি টাকার বিনিময়ে রফাদফা হয়েছে। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
নিহতের মা কান্নাজড়িত কন্ঠে জানান, আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই। তিনি আর কিছু বলতে পারেন নি।
কুমিল্লা উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবু কাউছার অনিক জানান, দিন-দুপুরে সবার সামনে হত্যাকান্ডটি হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আসামিদের গ্রেফতার করার জন্য প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়েও অনেক প্রশ্ন উঠেছে। দিনের আলোয় সবার সামনে খুন হল শান্ত। যে ঘাতকের আঘাতে শান্ত খুন হল, অন্যরা আহত হল। সেই ঘাতক সাজিব কিভাবে স্বাক্ষী হয় ? আর একজন ক্যান্সার রোগিকে পূর্ব দ্বন্দ্বের জের ধরে কিভাবে আসামি করা হল ? তাহলে প্রশাসন কি করলো ? ঘাতক কি প্রশাসন থেকেও শক্তিশালী? এমন হাজারো প্রশ্ন এখন দেবিদ্বারবাসির মুখে মুখে।
মূল ঘাতককে আসামি না করে স্বাক্ষী এবং ক্যান্সার রোগি সাদ্দামকে কেন আসামি করে গ্রেফতার করা হয়েছে জানতে চাইলে দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কমল কৃষ্ণ ধর জানান, বাদিপক্ষ যদি সাজিবকে আসামি না করে, তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। তারা ক্যান্সার রোগি সাদ্দামকে আসামি করেছে। আমরা তদন্ত করছি। আর মোটা অংকের টাকা রফাদফার বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Author

bikedokan@gmail.com

Related Posts

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা

কুবি প্রতিনিধি: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) শাখা ছাত্রদলের নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ইংরেজি বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান শুভকে...

Read out all

কুমিল্লায় ১ লাখ ৬০ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক-৫

নিজস্ব প্রতিবেদক: কুমিল্লা সদর দক্ষিণের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ারবাজার এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার পিস ইয়াবাসহ পাঁচজনকে আটক করেছে জেলা...

Read out all

কেন আত্মগোপন গেলেন শিবির নেতা; উদ্ধারের পর কেন ধ/র্ষ/ণ ও ভ্রু/ণ নষ্টের মামলা দিল নারী?

নিজস্ব প্রতিবেদক কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ধর্ষণের মাধ্যমে এক নারীকে অন্তঃসত্ত্বা করার পর ওষুধ খাইয়ে তার ভ্রূণ নষ্ট করার অভিযোগে ছাত্রশিবিরের এক নেতার বিরুদ্ধে...

Read out all

কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান আহসান পারভেজ

কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে নতুন হিসেবে চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছেন মো. আহসান পারভেজ। তিনি দেবিদ্বার সরকারি এস এ সরকারি কলেজের...

Read out all

মানবাধিকার কর্মী মওদুদের দায়ের করা মামলায় সাইবার অপরাধ তদন্তে সিআইডি

​স্টাফ রিপোর্টার।। কুমিলা কোতোয়ালি থানায় মানবাধিকার কর্মী মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্রর দায়ের করা একটি মামলাকে কেন্দ্র করে সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত কার্যক্রম...

Read out all

কুমিল্লায় ৯৯৯ এ ফোনে তদন্তে আসা পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে জখম

জেলা প্রতিনিধি:কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে এক পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার (৩ জুন) রাত প্রায় ১০টার দিকে উপজেলার...

Read out all