সদ্য প্রাপ্ত সংবাদ:
কুমিল্লায় যুবককে কুপিয়ে হত্যা মামলার পলাতক আসামী গ্রেফতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে আমরা বাধা দিচ্ছি না : কুমিল্লায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রকৌশলীদের ভূমিকা রাখতে হবে-এমপি বাহার কুমিল্লায় সাংবাদিকের উপর ছাত্রলীগের হামলা! কুমিল্লায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে পিকনিকের বাস খাদে চৌদ্দগ্রামে সেলাই মেশিন ও শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ কুমিল্লায় সেনা সদস্যকে গুলি করে হত্যা কুমিল্লায় মুক্তিযোদ্ধার উপর হামলা,দুই লাখ টাকা লুটের অভিযোগ কুমিল্লায় স্কুল ছাত্রীর লাশ উদ্ধার; আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ? কুবির এ ও বি ইউনিটের পরীক্ষা সম্পন্ন, শনিবার সি ইউনিটের পরীক্ষা

সাপের কামড়: সতর্কতার অভাবে না ফেরার দেশে কুমিল্লার কেয়া মনি

(জাগো কুমিল্লা.কম)
একটা সময় ছিল যখন বিষাক্ত সাপের কামড় মানে ছিল নির্ঘাত মৃত্যু; কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে আমরা সাপের কামড়ে মানুষের মৃত্যুহার অনেকাংশে কমিয়ে এনেছি। একটু সতর্কতার অভাবে না ফেরার দেশে চলে গেল কুমিল্লার পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী মোসাঃ কেয়া মনি (১০) । গোখরা সাপের কামড় দেওয়ার পর সঠিক চিকিৎসা না দেওয়া আট ঘন্টার পর তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। সে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার দক্ষিণ গোপালনগর গ্রামের সর্দার বাড়ীর আবদুল কুদ্দুছের মেয়ে

 

Milking a snake for venom which is then used to manufacture antivenom.

কিছুদিন পূর্বেও সাপের কামড়ের একমাত্র চিকিৎসা ছিল ঝাড়ফুঁক ওঝা এবং দুধ ও গোবর থেকে দূরে থাকা। সময়ের সাথে সাথে আবিষ্কার হয়েছে এন্টি ভেনম; সাপের কামড়ে এখন বেশী মানুষ মরে না । সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করার ঔষধ (antisnake venom) চিকিৎসা সেবা শুধু মাত্র কুমিল্লা জেনারেল (সদর) হাসপাতালে রয়েছে। সাপের কামড়ের বিষ নিষ্ক্রিয় করার চিকিৎসা সেবা কুমিল্লার একটি মাত্র হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা কেন?

এ বিষয়ে কুমিল্লা সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ মুজিবুর রহমান বলেন, সাপের কামড়ের চিকিৎসা করার জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার প্রয়োজন। অনেকে ভয়ে ইনজেকশন পুশ করে না। বর্তমানে কুমিল্লায় শুধু মাত্র সদর হাসপাতালে সাপে কামড়ের চিকিৎসা দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে আমরা সিভিল সার্জন ফেসবুক পেইজে বিজ্ঞাপন দিয়েছি এবং উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্দেশনা রয়েছে সাপে কামড়ের রোগীদের সরাসরি সদর হাসপাতালে পাঠানো জন্য।

এদিকে বুড়িচংয়ে কেয়া মনিকে সাঁপে কামড় দেয় সন্ধ্যায় পরবর্তীতে দীর্ঘ আট ঘন্টা অতিবাহিত হলেও তাকে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে আনা হয়নি। রাত ১১ টায় নিয়ে যাওয়া হয় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ততক্ষণে না ফেরার দেশে চলে যায় কেয়া মনি।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, গোপালনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী কেয়া মনি গত শনিবার সন্ধ্যায় ঘরের আলো জ্বালাতে গেলে চালের ড্রামের নিচ থেকে হঠাৎ তাকে একটি বিষধর গোখরা সাপ কামড় দেয়। ওই দিন রাত ৮টার দিকে তাকে ব্রাহ্মণপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসলে হাসপাতালের কতর্ব্যরত চিকিৎসক জানায় বর্তমানে হাসপাতালে বিষধর সাপের কামড়ের চিকিৎসা করার জন্য কোন ঔষধ নেই। তারপর রাত ১১টায় তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে কতর্ব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কেয়া মনির অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

কুমিল্লা সিভিল সার্জন ফেসবুক সূত্রে পাওয়া রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ এর মেডিসিন স্পেশালিস্ট এর ডাঃ রতীন্দ্র নাথ মন্ডল এ বিষয়ে নির্দেশনা যা জাগো কুমিল্লা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

সাপ কামড়ানোর সম্ভাব্য স্থান:
১। রাতের বেলা মাঠে মাছ ধরতে গিয়ে সাপ কামড়ায়।
২। বর্ষার সময় চারিদিকে যখন পানি থাকে তখন সাপ শুকনো জায়গার জন্য বাসার ভিতরে আশ্রয় নেয়। সাধারনত খড়ি রাখার জায়গায়, বিছানায়, রান্না ঘরে, আলনায় সাপ আশ্রয় নেয়। এসব জায়গায় অন্ধকারে/শব্দহীন ভাবে গেলে সাপ কামড়ানোর ঝুঁকি অনেক থাকে।
৩। রাতের বেলা অন্ধকার রাস্তায় চলার সময়। (কারন সাপ সাধারনত রাতের বেলা চলাচল বেশি করে)।
৪। মুরগী বা হাঁসের ঘরে।
৫। গরমের সময় বারান্দায় ঘুমানোর সময়।

সাপ কামড় থেকে প্রতিকার পেতে কি করা উচিত?

সাপ কামড়ের ঘটনাগুলো সাধারনত মে থেকে অক্টোবর মাসে হয়ে থাকে। কারণ এই সময় বৃষ্টি হয়, চারিদিকে পানি থাকে। সাপ সাধারণত পানিতে থাকতে চায় না। তাই শুকনো জায়গার জন্য বাসা-বাড়িতে আসে। সেখানে কোন ভাবে মানুষের সাথে কন্টাক হলে, সাপ নিজেকে threatened মনে করলে তখন দংশন করে।

১। রাতের বেলা জরুরী প্রয়োজন ছাড়া মাঠে যাবেন না। গেলে অবশ্যই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করে যাবেন। যাবার সময় বড় একটা লাঠি নিয়ে একটু দূর থেকে লাঠি দিয়ে শব্দ করে যাবেন। শব্দ শুনলে সাপ অবশ্যই চলে যাবে।
২। খড়ি আনতে যাবার সময় লাঠি দিয়ে আগে শব্দ করে তারপর খড়ি নিতে যাবেন।
৩। রাতে রাস্তায় চলাচলের জন্য টর্চ লাইট অবশ্যই সঙ্গে রাখুন।
৪। মুরগী বা হাঁসের ঘরে লাঠি দিয়ে শব্দ করে পরযাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করে যাবেন।
৫। গ্রামের বিছানায় শোবার আগে কোন কিছু দিয়ে শব্দ করুন, ভালো করে দেখে বিছানায় শোবেন।
৬। কোনভাবেই বারান্দায় বা বাইরে ঘুমানো যাবে না।

সাপ কামড়ালে কি করবেন?

১। আতংকিত হবেন না। কারন সাধারনত শতকরা ৯৬-৯৭ শতাংশ সাপ দংশন হয় অবিষাক্ত সাপ দ্বারা
২। যে জায়গায় সাপ কামড় দিয়েছে সে জায়গাটা নাড়ানো যাবে না। ক্রেপ ব্যন্ডেজ দেয়া সবচেয়ে ভাল। তবে গ্রামে পাতলা গামছা বা শাড়ির কাটা অংশ দিয়ে লুস করে বেঁধে দিতে হবে। বাধার উদ্দেশ্য হল, যেন lymphatic drainage হতে না পারে, আর রোগী ওই অংশটা নাড়াতে না পারে। (সাপের বিষ lymphatic দিয়ে শরীরে ছড়িয়ে যায়)।
৩। কোন ভাবেই রোগীকে ঝারফুক, কবিরাজী, সাপ কাটার জায়গা ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলা এসব করা যাবেনা। কারণ কোনভাবেই সময় নষ্ট করা যাবে না। বিষাক্ত সাপ কামড়ালে যত তাড়াতাড়ি সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করার ঔষধ দেয়া যাবে রোগী তত ভালো হবার সম্ভবনা বেশী।
৪। রোগীকে দ্রুত কাছের হাস্পাতালে নিয়ে যাবেন, যেখানে সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করার ঔষধ এবং কৃত্রিম্ভাবে শাস-প্রশাস দেবার ব্যাবসহা আছে।
৫। অবশ্যই রোগীকে সাপ কামড়ানোর সময় থেকে ২৪ ঘন্টা অব্জারভ করে তারপর হাস্পাতাল থেকে নিয়ে যাবেন। কারন সাধারনত সাপ কামড়ানোর ২৪ ঘন্টার মধ্যে বিষক্রিয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে বিষক্রিয়ার কোন লক্ষন না হলে আর ভয়ের কোন কারন নেই।

কবিরাজরা ঝারফুক সম্পর্কে কিছু কথা:

এটি আসলে একটি ভুল তথ্য। আমাদের দেশে মাত্র ৪ প্রজাতির বিষাক্ত সাপ আছে-কালকেউটে, গোখরা, রাসেল ভাইপার আর গ্রিনপিট ভাইপার। আর সমুদ্রে সামুদ্রিক সাপ বিষাক্ত। এদের মধ্যে আমাদের এদিকে শুধুমাত্র কালকেউটে, গোখরা সাপ পাওয়া যায়। ইদানিং রাজশাহীর বরেন্দ্রতে রাসেল ভাইপার পাওয়া গেছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে বিষাক্ত সাপের সংখ্যা খুব কম। তাই ১০০ জন মানুষকে যদি সাপ কামড়ায় তাদের মধ্যে ৯৮ জনকেই অবিষাক্ত সাপ কামড়াবে।

মাত্র ২/৩ জনকে বিষাক্ত সাপ কামড়াবে। কবিরাজ যদি এই ১০০ জন রোগীকে ঝারফুক শুরু করে তবে ৯৫ জনেও বেশি ভালো হবে আর যে ২/৩ জনকে যাদের বিষাক্ত সাপ কামড় দিয়েছে তারা ভালো হবেন না। তাদেরকে কবিরাজ বলবে যে আমি পারব না, মেডিকেলে নেন। তাহলে কবিরাজ এর সফলতার হার ৯৫%। তাই সবাই বলে কবিরাজ সাপ কামড়ানো রোগী ভালো করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বিষাক্ত সাপে কামড়ানো রোগীগুলোর ঝারফুকের এই সময়টা অনেক মূল্যবান। এ সব না করে রোগীকে দ্রুত হাস্পাতালে পাঠালে দ্রুত চিকিতসা শুরু করলে রোগী ভালো হবার সম্ভবনা অনেক বেশি। এসব ঝার-ফুক করে সময় নষ্ট করার কারনে অধিকাংশ বিষাক্ত সাপে কামড়ানো রোগীগুলো হাস্পাতালে যাবার রাস্তায় মারা যায়।

লেখক: ডাঃ রতীন্দ্র নাথ মন্ডল, মেডিসিন স্পেশালিস্ট, রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ।

এই বিভাগের আরও খবর

এই সংবাদটি নিয়ে আপনার মূল্যবান মতামত জানান: